গল্পে-কবিতায় আমার দেশের শিক্ষা অফিসের আচার-রীতি-নীতি।। কলামে: জান্নাতুল ফেরদৌসী

https://www.khoborjal25.blogspot.com/
পড়ুন-বুঝুন-বিবেচনায় মতামত পেশ করুন:

👉গল্প: "তিন বোনের পথচলা"
জান্নাতুল ফেরদৌসী )


একটি ছোট্ট শহরে তিন বোন ছিলেন—সাবাহ, লাবিবা ও রুমাইয়া। তিনজনই স্কুল শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়াই ছিল তাদের নেশা আর পেশা। জীবনের কঠিন সংগ্রাম পেরিয়ে আজ তারা দাঁড়িয়ে ছিলেন সমাজ গড়ার প্রথম সারিতে।

একদিন তারা তিনজন গেলেন শিক্ষা অফিসে—একটু জরুরি কাজ নিয়ে। সার্ভিসবুকের ফটোকপি করতে হবে, জানতে হবে শ্রান্তিবিনোদনের ভাতা কবে পেয়েছেন, আর আইবাস পোর্টালে বদলি হওয়া স্কুলের নাম কীভাবে পরিবর্তন করা যায়, সেটিও জানার প্রয়োজন।

কিন্তু শিক্ষা অফিসে ঢুকতেই যেন এক অদৃশ্য দেয়াল ঠেলে যেতে হলো তাদের। অফিস সহকারীরা বললেন, "আবেদন না করলে সার্ভিসবুক দেখতে দেওয়া যাবে না। শ্রান্তিবিনোদনের তারিখ? সেটা দেখানো যাবে না। আর স্কুলের নাম পরিবর্তন? সেটা তো অনেক ঝামেলার ব্যাপার।"

সাবাহ বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "দেখানো যাবে না মানে? কেন?"

অফিস সহকারী কিছুটা অনিচ্ছায় রেজিস্ট্রার খুলে দেখালেন তারিখটা। তাহলে প্রথমে এমন কটু কথা বলার দরকারটা কী ছিল?

তারা হতাশ হলেও হার মানলেন না। তিন বোন রওনা হলেন এজি অফিসে। সেখানেও কিছুটা সংশয় ছিল—কারণ তারা শুনেছেন, টাকা ছাড়া কাজ হয় না। কিন্তু আজ ভিন্ন কিছুই ঘটল। একজন সদাচারী অফিসার বিনা অজুহাতে, বিনা দুর্ব্যবহারে, তাদের স্কুলের নাম পরিবর্তনের কাজ সম্পন্ন করে দিলেন।

রুমাইয়া মুগ্ধ হয়ে বললেন, "আল্লাহর রহমতে এখনও ভালো মানুষ আছেন বলেই পৃথিবীটা চলছে।"

তারা তিন বোন ফিরে তাকালেন শিক্ষা অফিসের দিকেই। সেখানে শিক্ষক মানে কেবল সেই, যার ‘উচ্চপর্যায়ে’ পরিচয় আছে, অথবা যারা অফিসে যেয়ে সময় কাটায়। অন্যদের জন্য থাকে অবহেলা, কটু কথা, আর অকারণ দৌড়ঝাঁপ।

তবে আজ তারা বুঝলেন, যে পথটা কঠিন, সেই পথেই আলো থাকে।
যেখানে সম্মান দেয় না কেউ, সেখানেও কিছু মানুষ থাকেন—যারা শিক্ষকের সম্মান বোঝেন, কাজকে সম্মান করেন।


নৈতিক শিক্ষা:

এই গল্প আমাদের শেখায় যে, সম্মান আর দায়িত্ববোধ কেবল বড় পদ বা শক্তিশালী পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—বরং তা একজন মানুষের অন্তরের আচার-আচরণ, মনমানসিকতা এবং দায়িত্ব পালনের ইচ্ছার মধ্যেই প্রকাশ পায়।

প্রশাসনিক জটিলতা ও বাধা আমাদের থামিয়ে দিতে পারে না, যদি আমাদের মনোবল অটুট থাকে।

একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞান দান করেন না, নিজের ন্যায্য অধিকার আদায়ে সাহস ও দৃঢ়তা দেখিয়ে সমাজকে পথ দেখান।

কর্তব্যপরায়ণ এবং সদাচারী একজন মানুষও সমাজে অনেক বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারেন—শুধু তার আন্তরিকতা ও সততার মাধ্যমে।

আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ভালো মানুষ এখনো আছেন, যারা বিনা স্বার্থে, বিনা অসম্মানে, অন্যের কাজ করে দেন—তাদের কারণেই সমাজে এখনো আলোর রেখা দেখা যায়।

 গল্পটি তাই আমাদের বলে:
সমস্যা যতই থাকুক, সত্য, ধৈর্য আর সততার পথেই সাফল্য ও সম্মান নিহিত

👉ছন্দে-রসে আরও কিছুটা সময়:

তিন বোন হাঁটে মাথা তুলে, চুপিচুপি নয়,
তারা শিক্ষক—তাদের চোখে স্বপ্নের বিস্তর প্লাবন রয়।
সার্ভিসবুক, ভাতা আর স্কুলের নামের সংশোধন,
হাতের ফাইলে ধরা শতচিন্তার সম্মিলন।

শিক্ষা অফিসের দরজায় দাঁড়ায় তারা গর্বে,
যাদের কাজ শিক্ষককে সেবা দেওয়া, তারাই বাঁধে রবে।
"দেখানো যাবে না,"—ঠোঁটের কোণে কটূ হাসি,
কেন যেন সম্মানের বদলে মেলে অবহেলার গ্রাসী।

তবু তারা থেমে যায় না, চলে এজি অফিসে,
শুনেছিল টাকার খেলা, মনটা ছিল বিষে।
কিন্তু সেখানে মেলে এক আলোর মানুষ,
যার মনেতে সদা সততা, নয় কোনো ফাঁকফোকর গহিন ফাঁদ-ফাঁস।

বিনা ঘুষে, বিনা গর্জনে কাজ হয় সুষ্ঠুভাবে,
মনের কোণে ফুটে ওঠে শুকরিয়ার অনুরাগ রবে।
আল্লাহর রহমতে এখনও আছেন এমন মানুষ,
যারা সম্মান দেন, আর শিক্ষা পেশায় রাখেন প্রশ্বাস।

শিক্ষা অফিসে মুখ চেনা গুণে যাদের উঠে দাম,
আর সত্যিকারের শিক্ষকেরা হারান বারংবার নাম।
তবু শিক্ষকতা তো শুধুই চাকরি নয়—
এ এক সংগ্রাম, এক আলো ছড়ানোর মধুর অবয়ব।

তিন বোন ফিরে আসে না হার মেনে,
তাদের সাহস ছড়ায় গল্পে, কবিতায়, গানে।
কারণ ভালো মানুষ আছে বলেই,
পৃথিবীটা এখনও দাঁড়িয়ে—আশার ছায়াতলে।

( ২০.০৪.২০২৫)




Post a Comment

Previous Post Next Post