যেখানে যেমন : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের গুনগত মান ও উন্নয়ন

https://www.khoborjal25.blogspot.com/

যেখানে যেমন : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের গুনগত মান উন্নয়ন

 

মানুষ তার ছোট্ট ইচ্ছাশক্তি থেকে কিছু ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে থাকে। আমি পেশায় একজন শিক্ষক। লেখালেখি আমার শখ।

যে বোধশক্তি আমাকে লেখার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে, সেই বোধোদয়ই আমার এই লেখার মূল পটভূমি। আমি অলিগলি ঘুরেছি,দেখেছি আমার সোনার বাংলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার চালচিত্র। দেখেছি এই স্তরের সম্মান,কৃতিত্ব,গ্রেড,স্বীকৃতি। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়,সেখানে প্রাথমিক শিক্ষা-শিক্ষক,শিক্ষার্থীর মান কতটা উর্ধ্বে। বলা যায়,সর্বোচ্চচূড়ায়।

অথচ আমাদের বাংলাদেশে শিক্ষা গ্রহণের প্রথম স্তরের মান যেমন নিম্নগামী,তেমনি অপমানজনক।

                              আমার এই কলামে সেই প্রাথমিক শিক্ষার খুঁটিনাটি কিছু চিত্র সাহিত্যের গদ্য-পদ্য রসে,কলমের খোঁচায় প্রকাশ করার চেষ্টা চালিয়েছি মাত্র।

 

কালের চক্রবানে শিক্ষাব্যবস্থার সূত্রপাত হয় প্রাচীন যুগ থেকেই। তখন শিক্ষাদান এবং গ্রহন ছিল একঘরে। একটা গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ ছিল।

         যুগ হিসাব করলে আমরা শিক্ষার ধারাকে, ৪টি প্রধান পর্বে ভাগ করে বর্তমানের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার পূর্বরূপ দেখতে পাবো:


হাতেখড়ির চতুষ্কোণ

প্রাচীন আমল

বৃটিশ আমল

পাকিস্তান আমল

বাংলাদেশ আমল

মূলত এই তিনকোণা ছাউনি থেকেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সূত্রপাত। বলাবাহুল্য মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য অবশ্যই সমপরিমান মসলার প্রয়োজন হয়ে থাকে। যদি কোনো একটির কমতি হয়েছেতো, সেই গাঁথুনী নড়বড়ে হবেই।

প্রসঙ্গত এই কথা বলার অর্থ এটাই যে, ক্রমবর্ধমান শিক্ষার ভিত যে পাত্র থেকে শুরু হয়েছে, সেখানে মুষ্টিমেয় কিছু বেঁধে দেওয়া নিয়মনীতিতেই কেবল আবদ্ধ ছিল।

শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য ? একথাটায় তখন বচনাতীত ছিল।

আজ আমাদের শিক্ষাদানে এবং গ্রহনে কোনো বৈষম্য না থাকলেও, জগাখিচুড়ির হট্টগোল বিরাজমান। বিশেষ করে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাঙ্গণে। তার সাথে যুক্ত আছে শিক্ষকদের নিয়ে নাকসিঁটকানী,একঘরে বামনচাঁদ সম্মানী।

 

যদিও যুগের নব নব স্রোতে এগিয়ে চলেছে দেশের শিক্ষাক্রম-শিক্ষাব্যবস্থা-শিক্ষক-শিক্ষার্থী। কিন্তু এই স্তরের মান-মর্যাদা ৩য় শ্রেণিতেই সীমাবদ্ধ আজও। অথচ দেশের ছোট-বড়,নামী-দামী,ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার,জজ-ব্যারিস্টার যত পদের সম্মানী পেশার ব্যক্তিবর্গ আছেন, কেউই কিন্তু প্রাথমিক স্তর পার না হয়ে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করেননি।  

যে শিক্ষাস্তর পুঁথিগত শিক্ষাগ্রহণের সূতিকাগার, সেই স্তরের মান-মর্যাদা-গ্রেড কেনো এই বাংলাদেশে এতো নিম্নস্তরে ?

অথচ উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায় সেখানে প্রাথমিক স্তরের স্থান প্রথম শ্রেণির আসনে। এমনকি শিক্ষাব্যবস্থাও “কর্মকেন্দ্রিক”।

আমার বাংলায় আমি যেনো কোনো সুশৃঙ্খল-নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষাক্রমের সংবিধান খুঁজে পাইনে। কেমন যেন সব জগারামের জগাখিঁচুড়ী শিক্ষাক্রম, আর সাথে থাকছে এই স্তরের শিক্ষকদের গ্রেডেশনের মানদণ্ড।

গোলমেলে দেশের ভাবমূর্তির আশু পরিবর্তনের পাশাপাশি নব আলোর উদয় আবশ্যক “প্রাথমিক স্তর” এ।

যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে চলেছে। তথ্য ও প্রযুক্তিতেও বাংলাদেশের নৈপুন্যতা আজ "বিশ্ব ছোঁয়া"-বললে ভুল হবেনা।

    কিন্তু এই বিশ্ব ছোঁয়া কৃতিত্ব আমাদের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা ক্ষেত্রে কতটুকু সার্থকতা অর্জন করে চলেছে?

  এই প্রশ্নের উত্তর যদি দিতে যাই,তাহলে আমি বলব ১০%। এই কারণে যে,আমাদের উন্নয়নশীল

  দেশে দিনমজুরের/দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যায় বেশি।কোনো শতকরার হিসাবে নয়,স্বাভাবিক হিসাব কষলেই তার চালচিত্র চোখে ভেসে আসবে।

দেশের নিম্নবিত্ত,মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত - এই ত্রিমাত্রিক সমাজ কাঠামোর মাঝে এগিয়ে চলেছে

" উচ্চবিত্ত"শ্রেণির ব্যক্তিবর্গ ৯০%। বাকি ১০% এর ৮% মধ্যবিত্ত শ্রেণির এবং  ২%নিম্নবিত্ত শ্রেণির ব্যক্তিবর্গ। আজ আমরা যুগের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে,যে যেভাবেই পারছি লুফে নিচ্ছি  নিজস্ব কৃতিত্ব। কিন্তু আমরা এটা ভাবছি না যে,আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা কোথায় ঠেলে দিচ্ছি। তারা তাদের সূতিকাগার/স্বকীয়তা/দেশাত্মবোধ/মূল্যবোধ,নীতিবোধকে কোথায় পদপৃষ্ঠ করছে।

তারা আধুনিকতার অহংকে ধূলায় মিলিয়ে নিজের নিজস্বতা কতটা স্খলিত করছে। সত্যিই কি 

  আমরা আমাদের স্বকীয়তার মাঝে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অবহিত বা শিক্ষা দান করছি? কতটা উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হয়েছি আমরা তাদের মনমানসিকতার ? সত্যিই কি সভ্য জাতি হয়ে গড়ে

 উঠছে ? আমরা কি তাদের দেশাত্মবোধের দীক্ষায় দীক্ষিত করে তুলছি ? সহবোধ জ্ঞান অর্জনে কত উন্নতি হয়েছে তারা,একবার কি ভেবে দেখেছি।

 এর সাথে সম্পৃক্ত রাষ্ট্র,সরকার,নীতিমালা,সমাজ,পরিবার ইত্যাদি ব্যবস্থাপনা। "কর্তায় ইচ্ছায় কর্ম"-অতি পরিচিত এই বাক্যই হয়ে গেছে আমাদের সহজাত প্রবৃত্তির বাহন।

আরও একবার ভেবে দেখুন তো,আমার - আপনার মাঝে যে হিতাহিত জ্ঞান,বোধদয় বিরাজ করে,তার সিকি পরিমাণও কি আমদের প্রজন্মের ভিতর রেখাপাত করেছে ? "প্রশ্নের পর প্রশ্ন"- সত্যিই বিরক্তিকর।কিন্তু এই প্রশ্নগুলোই চরম সত্য। আমরা শিক্ষিত করতে গিয়ে,গড়ে তুলছি ভঙ্গুর,দেশাত্মবোধহীন প্রতিবন্ধী প্রজন্ম ; যেখানে শিষ্টাচার,নীতিবোধ-মূল্যবোধ,সচেতনতা,ভদ্রতার কোনো কানাকড়ি খুঁজে পাওয়া যায় না।

শিক্ষা গ্রহণের প্রথম মূল ভিত্তি স্তর " প্রাথমিক বিদ্যালয়"।

যার সম্মান আমাদের দেশে সর্বনিম্নে। নাসারন্ধ্রে জ্বালা ধরায় এই স্তরের মান-মর্যাদা স্থাপনে।

"নড়বড়ে ভিত্তিপ্রস্তর"- কীভাবে একটা সুস্থ জাতি উপহার দিতে পারে,তা সর্বদায় প্রশ্নাতিত। জাতি তার নিজস্ব গতিতেই বহমান। কোন দিকে এগিয়ে চলেছে আমাদের দেশের নীতিবোধ ?

আমার মতে,বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দিনে দিনে যত প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে,যে ক্যাটাগরির ছেলেমেয়েরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসে ভর্তি হচ্ছে তাতে করে,“কর্মমুখী ”শিক্ষাক্রমই প্রাথমিকের ক্ষেত্রে উপযুক্ত । সাথে থাকবে শিষ্টাচারের দীক্ষা।

সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়,সার্বিকভাবে একটি আদর্শ জাতি যদি আমরা উপহার দিতে চাই, তাহলে নিম্নের ধাপের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। শুরুটাকে সম্মানের প্রথম সারিতে রাখতে হবে। এমনকি শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে তৈরি করে তুলতে হবে দেশরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে।

প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা যেমন হতে হবে বাংলাদেশেঃ

ü  শিক্ষক হবেন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা; কারণ-শিক্ষক থেকে শতশত কর্মকর্তার জন্ম

ü  থাকবে না শিক্ষকদের উপর দাপ্তরিক কাজের অতিরিক্ত চাপ, যখন-তখন বিদ্যালয় ত্যাগের ডাক

ü  শিক্ষাক্রম হবে কর্মমুখী; মেধা অনুসারে শিশুরা গড়ে উঠবে শুরু থেকেই

ü  প্রাথমিক স্তর থেকেই শুরু হবে সকল শিশুর জন্য দেশ রক্ষার প্রশিক্ষণ(৫ম শ্রেণি থেকে)

ü  থাকবে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন

ü  সকল ধর্মের প্রার্থনালয় থাকবে

ü  থাকবে শিশুপার্ক

ü  শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের ভ্রমণ/মিলনমেলার আয়োজন থাকবে

ü  সুদ-ঘুষমুক্ত সরকারি যেকোনো ধরনের দাপ্তরিক কাজে থাকবে না দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষার প্রহর

ü  থাকবে না কোনো রাজনীতি-কমিটি-সভাপতি

ü  থাকতে হবে বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষার্থী-মূলায়ন ব্যবস্থা

শুরু হোক এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রাথমিক থেকেই। সেই আশাবাদ জ্ঞাপন করি; শুভকামনা…

২৭/০৮/২০২৪



Post a Comment

Previous Post Next Post