প্রাথমিকের পাঠশালা: ( জান্নাতুল ফেরদৌসী )

https://www.khoborjal25.blogspot.com/
প্রাথমিকের পাঠশালা
( জান্নাতুল ফেরদৌসী )
===================================================================

শিক্ষার ভিত যেখানে গড়ে ওঠে,
সেই জায়গাটাই যেন আজ সবচেয়ে নড়বড়ে।
শুরুতে হাতেখড়ি, ছড়া, গল্প,
আসরের আলোয় উচ্চারণ শেখা—
তারাই তো হয় জাতির স্থপতি।
কিন্তু আজ?
তিন দফা দাবি নিয়ে কর্মবিরতিতে শিক্ষকবৃন্দ।
শিক্ষকের মুখে বিরক্তি, ক্লান্তি, ক্ষোভ—
চোখে নেই সেই আগুন, যেটা একদিন শিশুদের চোখে জ্বালিয়ে দিত।
আর শিশুরা?
তারা এখন ঘুমোচ্ছে একটু বেশি,
খেলছে সকালেও, মা-বাবার বকুনি ছাড়া।
একটু আয়েষ, কিছু বিশ্রাম—
পড়ার চাপে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া শিশুমনের জন্য যেন একটুখানি বর্ষাবিরতি।
তবুও প্রশ্ন জাগে—
এই অবকাশ কি উন্নতির, না আরও পিছিয়ে পড়ার?

প্রাথমিক স্তরই যদি হয় সবচেয়ে অগোছালো,
তবে মাধ্যমিকের ইটই বা কোথায় বসবে?
এই দেশে ক'জন শিক্ষক সময়মতো বেতন পান?
ক'জন শিক্ষক পাঠদানে পান সম্মান,
না কি তারা কেবল ADM, UEO এর দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত?
প্রশিক্ষণহীন শিক্ষক, উপকরণহীন শ্রেণিকক্ষ,
ভাঙা বেঞ্চে বসে সাদাকালো জীবনের পাঠ।
একদিকে স্মার্ট বাংলাদেশ, অন্যদিকে খালি পেটে স্কুলে আসা।
এই বৈপরীত্যই যেন আজকের প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিচ্ছবি।

শিশুরা শিখছে মুখস্থ করে,
ভাবনা শেখানোর দায় কেউ নেয় না।
শ্রেণিকক্ষে প্রশ্নের উত্তরের আগে আসে
বোর্ডের কোণায় ঝুলে থাকা ডেটলাইন।
সময় গেলে সরে যায়, শিশুরা থেকে যায় স্থির—
কোনো এক দুর্বোধ্য পাঠ্যবইয়ের পাতায়।
তাদের চোখে নেই আগ্রহ, নেই আলো,
শুধু আছে বোঝা—বইয়ের, দুঃখের, ভবিষ্যতের।

আর শিক্ষক?
তিনি বেতন চান, মান চান, মানুষের সম্মান চান।
চান না ছুটির দিনে অবৈতনিক প্রশিক্ষণ,
চান না চারপাশের অবহেলা।
তিনিও তো মানুষ, পরিবারের কর্তা,
নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তিত।
তবু তিনি থাকেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চৌকাঠে—
যতদিন না মন ভাঙে, না শরীর।

এই তো বাস্তবতা—
শিক্ষার ভিতেই ফাটল,
আর আমরা স্বপ্ন দেখি উন্নয়নের,
ভাবি, প্রগতির রেলপথে ছুটছে বাংলাদেশ।
কিন্তু ভিত যখন দুর্বল,
তাতে উঁচু ভবন দাঁড়ায় না।
প্রাথমিক শিক্ষার এই দৈন্যদশা আমাদের collective ব্যর্থতা—
এটা শুধুই শিক্ষক বা শিশুর নয়,
এটা আমাদের রাষ্ট্রের, সমাজের,
আর শেষমেশ—আমাদেরই বিবেকের প্রশ্ন।

 


 ''প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হলে জাতি শক্ত হয় না''

আজ আমরা এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি—প্রাথমিক স্তর—দীর্ণ, অবহেলিত এবং সংকটাপন্ন। যে পাঠশালায় শিশুদের হাতেখড়ি হয়, সেখানে আজ শিক্ষকরা দাঁড়িয়েছেন দাবি-দাওয়ার ব্যানার হাতে। পাঠ বন্ধ, শ্রেণিকক্ষ নিস্তব্ধ, আর ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা বাড়ির উঠোনে অলস পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আমরা যদি জাতি গঠনের কথা বলি, তবে আমাদের প্রথম নজর দেওয়া উচিত সেই স্থানে, যেখানে একটি শিশুর প্রথম বর্ণ পরিচয় ঘটে। কিন্তু বড় দুঃখের বিষয়, এই প্রাথমিক স্তরে আজ নেই যথাযথ প্রশিক্ষিত শিক্ষক, নেই পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ, নেই শ্রদ্ধার পরিবেশ। বরং আছে বঞ্চনা, অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার ছায়া।

একজন প্রাথমিক শিক্ষক আজ শুধু পাঠদান নয়, করতে হয় মিছিল, সমাবেশ, দপ্তরে দৌড়ঝাঁপ। অথচ তিনি একজন জাতি গঠনের কারিগর। তাঁর জীবনে যদি নিরাপত্তা না থাকে, প্রণোদনা না থাকে, তবে তিনি কীভাবে ভবিষ্যতের ভিত গড়বেন?

অন্যদিকে, শিশুরাও মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতির ফাঁদে আটকে পড়ছে। তারা ভাবতে শেখে না, প্রশ্ন করতে ভয় পায়, স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায়। কারণ, তাদের পাঠশালায় শিক্ষার চেয়ে পরীক্ষার চাপ বেশি, শিক্ষকের মুখে হাসির চেয়ে ক্লান্তি বেশি।

এই অবস্থার পরিবর্তন চাইলে আমাদের চাই সম্মিলিত উদ্যোগ। রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে, শিক্ষককে মর্যাদা দিতে হবে, অভিভাবককে সচেতন হতে হবে এবং সমাজকে প্রশ্ন তুলতে হবে—"আমাদের প্রাথমিক স্তর এমন কেন?"

শিক্ষা শুধু একটি অধিকার নয়, এটি একটি দায়িত্ব—আমাদের সকলের। কারণ ভিত যখন দুর্বল হয়, ভবিষ্যত তখন কাঁপে। আর আমরা যদি ভিত শক্ত করতে না পারি, তবে উন্নয়নের সুউচ্চ দালান শুধু চোখের ধোঁয়াশা হয়ে থাকবে।

ধন্যবাদ।

https://www.facebook.com/jannatul.ferdausi.82

Post a Comment

Previous Post Next Post