
জান্নাতুল ফেরদৌসী
ঘটনার উৎস: "সিঁড়িঘর"(আমার সাথে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা)
ঘটনার স্থান : নিজ বাড়ি
ঘটনার সময়কাল: ১৯৯৮-২০০০
#সত্য ঘটনা অবলম্বনে:
সবসময় আমাদের বাড়িতে চাঁদের হাট বসত। বাড়িতে আত্মীয় স্বজনের প্রায়ই আসা-যাওয়া থাকত। আমাদের নতুন বাড়িতে একটা অন্য রকম উৎসব চলত সর্বদা। বাড়ির ছাঁদে উঠার জন্য অস্থায়ী একটা সিঁড়ি তৈরি করা হয়।কারণ আমার মায়ের যতক্ষণনা পছন্দ হয়,ততক্ষণই ভাঙাগড়া চলে।সিঁড়ি ঘরটা একটু চাপা ছিল। তবে, চিকন-মোটা মিলিয়ে দেড়জন মানুষ একসাথে ছাঁদে উঠতে পারতেন। আমাদের বাড়িটা খুবই নিরিবিলি, নিশ্চুপ। আশেপাশের সবাই বলত" ভুতুড়ে বাড়ি"।
একবার সন্ধ্যায়, আমি আমার নানীর সাথে ছাঁদে গিয়েছিলাম হাওয়া খেতে।তখন গরমের সময় ছিল।যদিও আমার ছাঁদে উঠতে ভালো লাগতো না,তবুও নানুমনির কথায় গিয়েছিলাম। আমি নানীর সাথে ছাঁদে বসে গল্প করছি,এমন সময় আমার মাথার উপর দিয়ে কী যেনো একটা দমকা হাওয়ার মতো পশ্চিম দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্বকোণে উড়ে গেল। নানীকে জড়িয়ে ধরলাম।আর বললাম, "এক্ষুনি নিচেই চলেন,আমি ছাঁদে থাকবনা"।নানী আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে,চুপ করে বসে আছেন। আমি নানীর চিন্তা বাদ দিয়ে দৌড়ে নিচে নেমে আসতে যাচ্ছি, এমন সময় দেখি বিশাল লম্বা আকৃতির ছিপছিপে একটা মেয়ে, দুই ধাপ সিঁড়ির প্রথম ধাপে একটা পা এবং নিচের দিকে একটা পা দিয়ে আঁটকে রেখে দিয়েছে আমার যাওয়ার পথ।পরনে তার সম্পূর্ণ সাদা শাড়ি। চুলও মাশাল্লাহ; একতলা ছাঁদ থেকে নিচ পর্যন্ত, কেশ বতী কন্যে। কী করব বুঝতে পারছিলাম না।নানীকে দেখি মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছে।যদিও আমাদের বাড়ির চারপাশে মোটামুটি আলো জ্বালিয়ে রাখা হতো, তবুও ছাঁদে সম্পূর্ণ আলো যেতোনা। আমার সমস্ত শরীর ঠান্ডা-অবস হতে শুরু করে,মনে হয় ছাঁদের উপর শুয়েও পড়ি। যখন জ্ঞান ফেরে,তখন দেখি আমি আমার বেডে শুয়ে আছি। পাশে আমার নানী বসে আছেন। নানীর কাছে,বিষটি জানতে চাইলে,তিনি এবিষয়ে চুপ থাকতে বললেন। আমিও আর কিছু শুনার আগ্র দেখালাম না। আমাদের বাড়িতে নানী যতদিন ছিলেন, ততদিন এমন অদ্ভুত, অদৃশ্য কিছু ঘটনা ঘটতেই থাকে আমার সাথে। আমি আমার নানীর প্রিয় নাতি; হতে পারে তাই তার কাছে থাকা অদ্ভুত জিন-পরীগুলো আমার সামনে হাজিরা দিতে আসে!
নানী চলে যাওয়ার পরও যেনো,একটা গুমোট ভাব থেকেই যায়। নানী যেদিন আমাদের বাড়ি থেকে চলে যান,তার পরদিন আমি আর একাএকা শুতে পারতামনা।খুবই ভয় লাগত।মনে হতো, এই বুঝি সিঁড়ি দিয়ে সেই পেতনীটা আমার কাছে আসছে।
আমার মামা-খালারা আমাদের বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করতেন।তাই আমার খালাকে বলি আমার কাছে ঘুমাতে। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখি,আমার খালার পরিবর্তে আমার পাশে চিতাবাঘের মুখওয়ালা একজন দীর্ঘকায় লোক আমার দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে। এমন অবস্থায় আমি কানেও কোনো শব্দ-আওয়াজ শুনতে পারছিনা,আমার মাকে ডাকছি, অথচ সেই শব্দও যেনো রুমের বাইরে যাচ্ছে না। অবশ্য লোকটা কিছুই বলছে না,শুধুই চুপচাপ শুয়ে ছিল। ভাবলাম "আবার খালার ঘাড়ে,নানীর ভুত লাগনাতো!" আমি আবার পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম,শরীর কাঁপছে, হাত-পা নাড়াতেও পারছিলাম না, ভয়ে।কণ্ঠস্বরও বোবা হয়ে গেছে,যেনো। আবারও খালার দিকে ফিরলাম। তখন দেখি খালা শুয়ে আছে। আর একটা সাদা-কালো কাপড় সিঁড়ির দিকে উড়ে যাচ্ছে। আমি খালাকে নাড়ানোর চেষ্টা করি,কিন্তু খালা আমার গভীর ঘুমে তলিয়ে ছিল। আমার ডাক,নাড়ানো কিছুই তার কানে-গায়ে পৌছায়নি। আমি আবারও খালার থেকে উল্টো দিকে শুয়ে পড়লাম। তারপর আমার ঘরের জানালা থেকে অদ্ভুত গুমরানোর আওয়াজ শুনতে পাই। আমি দোয়া কালাম পড়তে থাকি।সমস্ত শরীর যেমন ঠান্ডা হয়ে উঠছিল, তেমনি গরমে ঘামও ঝরছিল। মনে হচ্ছিল আমার মুখের উপর কেউ কিছু লাগিয়ে দিচ্ছে। কেমন যেনো আঠালো,ভেজা রক্তের মতো কিছু। পরে ঘুম ভাঙলে,শুনি ফজরের আযান দিচ্ছে। দিনের বেলায় আমি এই বিষয়টি আমার খালা এবং ফোনে আমার নানীর সাথে শেয়ার করি।
মূলতঃ আমাদের বাড়িটা যেখানে তৈরি হয়েছে,পূর্বে সেখানে অনেক পীর-আওলিয়াগনের কবর ছিল।তাই আজও আমার আত্মীয় স্বজনরা,আমার ভাই-বোনেরা বেড়াতে এলে,তারা ঠিকমতো রাতে ঘুমাতে পারে না। কিছুনা কিছু অঘটন ঘটতে থাকে,তাদের সাথে। যদিও আমার সাথে এখন আর তেমন কিছু ঘটেনা।তবে,গভীর ঘুম আসতে আসতে,আমি কিছু গায়েবি আওয়াজ এখনো মাঝে মধ্যে শুনতে পাই।
==========০==========